প্রথমেই ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাস নিয়ে শামসুর রাহমানের করা
মন্তব্যটি তুলে ধরলাম,
“যখন হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’
প্রকাশিত হয়, তখন আমি দৈনিক বাংলার একজন সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলাম। বইটি
পড়ে আমার এত ভালো লেগেছিলো যে, স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আমি আমার কলামে সেই বইয়ের
নাতিদীর্ঘ আলোচনা করি। সেদিনই আমার মনে হয়েছিলো, আমাদের কথাসাহিত্যে নতুন একজন
কথাশিল্পীর আবির্ভাব ঘটেছে। এরপর সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদ
অনেকগুলো উপন্যাস রচনা করেছেন এবং ইতোমধ্যেই তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক।
জনপ্রিয়তা সম্পর্কে কারো কারো মনে সন্দেহের উদ্রেক হয় এবং কেউ কেউ বাঁকা উক্তিও
করে ফেলেন। কিন্তু দেখা গেছে অনেক উৎকৃষ্ট রচনাই অত্যন্ত জনপ্রিয়। হুমায়ূন আহমেদ
আমাদের সস্তা চতুর্থ শ্রেণীর লেখকদের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছেন। তিনি, সন্দেহ নেই,
বিশাল পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেছেন, যা সাহিত্যের পক্ষে উপকারী। এ কথা বলতে আমার
বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই যে, তিনি ভবিষ্যতে আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে কিংবদন্তির
মর্যাদা পাবেন।”
_ শামসুর রাহমান
দৈনিক জনকণ্ঠ
১৩ নভেম্বর, ১৯৯৮
হুমায়ূন আহমেদের লেখাগুলো পড়তে আমি খুবই ভয় পাই। নাহ
ভূতের গল্প তো নয় এগুলো। ভয় পাওয়ার কারণ এই যে, লেখাগুলো খুব সহজে মনের মধ্যে ঢুকে
যায়। কখনো কখনো গল্পের মধ্যেই নিজেকে কল্পনা করে বসি। আর এক সম্মোহনী ক্ষমতা আছে
তাঁর লেখায়। তাই পরপর তাঁর লেখাগুলো আমি পড়তে পারি না, বা চাই নাই। পড়ার পর হুট
করে কেমন জানি করে ওঠে মধ্যে। এই যে ‘হুট করে কেমন জানি করে ওঠে’ এটাই আসলে তাঁর
লেখার মূল বৈশিষ্ট্য।
‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসটি পড়ার সময়ও আমার মনোভাব একই হয়ে
গেছে। একটা মোহময়তা আছে এই উপন্যাসে। হুমায়ূন আহমেদ গল্পকথক হিসেবে নিজেই এই
গল্পটি বলছেন। কিন্তু তাঁর এই বলা, ভাবনা চিন্তার মাঝেই নিজেকে কল্পনা করে নেয়া
যায় অনায়াসে।
এক মধ্যবিত্ত পরিবার যেখানে বাবার স্বল্প আয়ের উপর
নির্ভর করা পরিবারে মোট লোকসংখ্যা ছয়জন এবং গৃহকর্তার বন্ধু মাস্টার কাকা; মোট
সাতজন। বড় মেয়ে রাবেয়া অপ্রকৃতিস্থ, কাজেই তার এখানে ওখানে অবাধ যাতায়াত। এরপর
খোকা হিসেবে আছেন গল্পকথক নিজে, এমএ পরীক্ষা দিবেন যিনি, বড়মা-এর ছেলে মন্টু বিএ
পড়ছে এবং আছে ছোট বোন রুনু। সাধারণভাবে গল্পের শুরুটা হলেও আস্তে আস্তে ঘটনার মোড়
ঘুরতে থাকে অন্যদিকে। গল্পের শেষ হয় রাবেয়ার মৃত্যু এবং মাস্টার কাকাকে হত্যার
অভিযোগে মন্টুর ফাঁসির মাধ্যমে। কিন্তু রাবেয়ার মৃত্যু হলো কিভাবে? কিংবা কেনো মন্টু মাস্টার কাকাকে খুন করলো? সেসব প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আপনাকে অবশ্যই এই বইটি পড়তে হবে।
এর মধ্যে মসলা হিসেবে আরো আছে শীলু নামে রুনুর বান্ধবীর
প্রতি গল্পকথকের প্রেম, রাবেয়াকে বিয়ে করতে চাওয়া হারুন সাহেবের বউ নাহার ভাবি এবং
রাবেয়ার প্রতি তার মমত্ববোধ, এত দুঃখের মাঝেও গল্পকথকের রসায়নের লেকচারারশীপের
সাড়ে চারশো টাকা বেতনের চাকরি পাওয়া। আর একটি কুকুর চরিত্রের কথা গল্পে পাওয়া যায় যার নাম পলা। শুধু পলাতক হতো বলেই এই নাম। একদিন সত্যিই পালিয়ে গেলো। রাবেয়া প্রায়ই তার খোঁজ করতো।
পরিশেষে সব আনন্দই হয়তো আসলে আনন্দের হয় না। যেমনটা দেখা
গেছে এই পরিবারে। যেখানে হঠাৎ খেই হারিয়ে ফেলা পরিবারটি শোক সন্তপ্ত, কিন্তু
সেখানে কারো চাকরি পাওয়ার সংবাদটা আসলেই কি আনন্দের? লেখক খুব সুন্দরভাবেই বুঝিয়ে
দিয়েছেন বাস্তবতা কতটা সত্য ও নির্মম হতে পারে। গল্পকথক চেয়েছিলেন চাকরি পেয়ে মা-কে নিয়ে
যাবেন সীতাকুণ্ডে, রুনুকে কিনে দেবেন সবুজ রঙের শাড়ি। চাকরি পেলেন কিন্তু সেই ইচ্ছা কি পূরণ হলো?
কিংবা মন্টুর ফাঁসির আদেশ হওয়ার পর ওই যে ইয়াসমিন নামের
মন্টুর বান্ধবীটি হঠাৎ এসে দেখে গেলো মন্টুদের বাড়িতে। সেকি মন্টুকে ভালোবেসেছিলো?
সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় নি। মার্সি পিটিশন উপেক্ষা করে ফাঁসি হলো মন্টুর।
জেলের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন গল্পকথক আর তার বাবা, জেলারের চিঠি দেখিয়ে মন্টুর লাশ
নিয়ে যাবার জন্য। কয়েকটি কাক উড়ে গেলো উপর দিয়ে।
.
.
বইটি ডাউনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন



0 comments:
Post a Comment